চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা যেন ক্রমেই পরিণত হচ্ছে আতঙ্কের জনপদে। একের পর এক সশস্ত্র হামলা, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কিন্তু এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে মামলা বা অভিযোগ করতে অনীহা কিংবা ভয়ের বিষয়টি সামনে আসছে।
সর্বশেষ সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত হয়ে ১২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মারা গেছেন প্রবীণ সমাজসেবক মুহাম্মদ সাইদুর রহমান তালুকদার (৭৫)। অথচ তাঁর ওপর হামলার ঘটনায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি। এর আগে একই ইউনিয়নে দুই হাত কেটে কৃষককে হত্যার ঘটনাও এলাকায় আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রোববার (১ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সাইদুর রহমান তালুকদার। তিনি সরফভাটা ইউনিয়নের পশ্চিম সরফভাটা ছনাগাজী তালুকদার বাড়ির বাসিন্দা। সরফভাটা ইউনিয়ন গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের সভাপতি এবং রাঙ্গুনিয়া-সরফভাটা নেছারিয়া তৈয়্যবিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসার দাতা সদস্য ছিলেন তিনি।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২১ অক্টোবর জঙ্গল সরফভাটা পাহাড়ে নিজের বাগান দেখতে গেলে চিহ্নিত কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় তাঁকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, পরে চট্টগ্রামের পার্কভিউ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে। অবস্থার অবনতি হলে ভর্তি করা হয় চমেক হাসপাতালে। সেখানে ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানেন তিনি।
হামলার পরও থানায় অভিযোগ নেই
সাইদুর রহমানের মৃত্যুর পর দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানা-পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হামলার ঘটনায় এর আগে কেউ থানায় অভিযোগ করেননি। দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হিলাল উদ্দিন আহমেদ জানান, মৃত্যুর খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধারের জন্য গেলে স্বজনরা এরই মধ্যে জানাজার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের জন্য লিখিত আবেদন করা হলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
একজন প্রবীণ সমাজসেবকের ওপর হামলার পরও কেন থানায় অভিযোগ করা হয়নি, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার পেছনে কোনো ভয় বা নিরাপত্তাহীনতা কাজ করেছে কি না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
দুই হাত কেটে কৃষক হত্যা
এর আগে গত ২৭ অক্টোবর গভীর রাতে সরফভাটা ইউনিয়নের মীরেরখীল সিঙ্গাপুর এলাকায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন কৃষক মো. নেজাম উদ্দিন (৪৫)। বন্য হাতির আক্রমণ থেকে নিজের আমন ধান রক্ষা করতে রাতে জমিতে পাহারা দিতে গিয়েছিলেন তিনি। পরদিন সকালে বিলের পাশে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশ জানিয়েছিল, দুর্বৃত্তরা তাঁর দুই হাত কেটে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করেছে।
স্থানীয়দের দাবি, কয়েক দিন আগে ঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। সেই চাঁদা না দেওয়ার জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে সন্দেহ তাঁদের। তবে চাঁদা দাবির অভিযোগ কিংবা হত্যার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
চাঁদা না পেয়ে প্রবাসীর পরিবারের ওপর হামলা
এরও আগে গত ৮ অক্টোবর দিবাগত রাতে সরফভাটার ১ নম্বর ওয়ার্ডের লুসার বাপের টিলা এলাকার জামির আলী তালুকদার বাড়িতে এক প্রবাসীর পরিবারের ওপর সশস্ত্র হামলার অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগীদের দাবি, পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে দুর্বৃত্তরা গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে একই পরিবারের পাঁচজনকে আহত করে। আহতদের মধ্যে তিন ও পাঁচ বছর বয়সী দুটি শিশুও ছিল।
ওমানফেরত প্রবাসী ও বিএনপি কর্মী মো. গোলাপ, তাঁর ছেলে আছিফ, বড় ভাই মোহাম্মদ সৈয়দ এবং পরিবারের দুই শিশু ওই হামলায় আহত হন। তাঁদের অভিযোগ, হামলাকারীরা বাড়িঘর ভাঙচুর করে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।
ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজনদের দাবি, এলাকার আরও কয়েকটি পরিবারকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।
রাঙ্গুনিয়ায় সন্ত্রাসী হামলা, হাসপাতালে আ.লীগ নেতার মৃত্যু
গত ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত আওয়মী লীগ নেতা নুরুল ইসলাম তালুকদার (৭০) মারা গেছেন। তিনি উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড মীরেরখীল গ্রামের ইন্নাল আমিন তালুকদারের বড় সন্তান ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি।
ওইদিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এর আগের দিন মঙ্গলবার সরফভাটা ইউনিয়নের মীরেরখীল এলাকায় হামলায় তিনি আহত হন।
স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে নুরুল ইসলাম সরফভাটা মীরেরখীল বাজারে নিজ দোকানে ছিলেন। হঠাৎ একদল সন্ত্রাসী তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তাকে দোকান থেকে বের করে প্রকাশ্যে বেধড়ক মারধর করে এবং কুপিয়ে জখম করে চলে যায়। সন্ত্রাসীরা চলে যাওয়ার দীর্ঘক্ষণ পরও কেউ কাছে যায়নি। প্রায় আধাঘণ্টা সড়কে পড়ে থাকার পর স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে।
বাড়ছে আতঙ্ক, নিরাপত্তা চান স্থানীয়রা
কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে একই ইউনিয়নে প্রবাসীর পরিবারের ওপর সশস্ত্র হামলা, কৃষককে নৃশংসভাবে হত্যা এবং প্রবীণ সমাজসেবকের ওপর হামলার পর মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ-আতঙ্ক বেড়েছে। তাঁদের অভিযোগ, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয়রা দ্রুত এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার, এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।
তবে তিনটি ঘটনায় একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। একের পর এক সহিংসতার পরও ভুক্তভোগীরা কেন অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি সরফভাটায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
লেআউট সিলেক্ট করুন
সরফভাটায় খুনের পর খুন, মামলা হয় না— কীসের আতঙ্ক?

