চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়নে একের পর এক সহিংস ঘটনায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৮ অক্টোবর রাতে চাঁদা না পেয়ে এক প্রবাসীর পরিবারের পাঁচজনকে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আহত করার অভিযোগ ওঠে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার বন্য হাতির আক্রমণ থেকে আমন ধান রক্ষা করতে গিয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন কৃষক মো. নেজাম উদ্দিন (৪৫)। তাঁর দুই হাত কেটে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) গভীর রাতে সরফভাটা ইউনিয়নের মীরেরখীল সিঙ্গাপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বুধবার সকালে খবর পেয়ে দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।

http://সরফভাটায় সন্ত্রাসীদের হাতে কৃষক খুন, চাঁদা দাবির অভিযোগ

নিহত নেজাম উদ্দিন সরফভাটা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মীরেরখীল স্লুইসগেট এলাকার বাসিন্দা। তিনি মো. রফিকুল ইসলাম রক্করের ছেলে। কৃষিকাজের পাশাপাশি গরু-ছাগল পালন করে পরিবার চালাতেন তিনি।
ধান পাহারা দিতে গিয়ে নৃশংস হত্যা
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বন্য হাতির আক্রমণ থেকে নিজের আবাদ করা আমন ধান রক্ষা করতে মঙ্গলবার রাতে জমির পাশে পাহারা দিতে গিয়েছিলেন নেজাম উদ্দিন। রাতের কোনো একসময় দুর্বৃত্তরা তাঁকে হত্যা করে বিলের পাশে মরদেহ ফেলে রেখে যায়।
সকালে স্থানীয় লোকজন বিষয়টি জানতে পেরে পুলিশকে খবর দেন। পরে দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।

http://চাঁদা না পেয়ে সরফভাটায় সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব, রক্তাক্ত প্রবাসী পরিবারের ৫ জন

দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিলাল উদ্দিন আহমদ জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেছে। প্রাথমিকভাবে তাঁরা জানতে পেরেছেন, বন্য হাতির আক্রমণ থেকে আমন ধান রক্ষায় রাতে পাহারা দিতে গিয়েছিলেন নেজাম উদ্দিন। সেখানে দুর্বৃত্তরা তাঁর দুই হাত কেটে তাঁকে হত্যা করেছে বলে জানা গেছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্‌ঘাটন ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ঘর নির্মাণ নিয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রের দাবি, কয়েক দিন আগে ঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে নেজাম উদ্দিনের কাছে চাঁদা দাবি করেছিল দুর্বৃত্তরা। চাঁদা না দেওয়ার জেরে তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন স্থানীয় কেউ কেউ। তবে চাঁদা দাবির বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণও এখনো নিশ্চিত নয়।
এর আগে প্রবাসীর পরিবারের পাঁচজন আহত
এর আগে গত ৮ অক্টোবর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে সরফভাটা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের লুসার বাপের টিলা এলাকার জামির আলী তালুকদার বাড়িতে একটি পরিবারের ওপর সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগীদের দাবি, পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে হামলাকারীরা গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে একই পরিবারের পাঁচজনকে আহত করে। আহতদের মধ্যে তিন ও পাঁচ বছর বয়সী দুটি শিশুও ছিল।
আহতদের মধ্যে ছিলেন ওমানফেরত প্রবাসী ও বিএনপি কর্মী মো. গোলাপ (৪৫), তাঁর ছেলে আছিফ (১৮), বড় ভাই মোহাম্মদ সৈয়দ (৫৫) এবং পরিবারের দুই শিশু। স্বজনদের অভিযোগ, গোলাপের ডান হাতে গুলি লাগে এবং বাম হাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। তাঁর ছেলে আছিফের কব্জিতেও গুরুতর আঘাত লাগে। হামলায় বাড়িঘর ভাঙচুরের পাশাপাশি নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজন ও আবুধাবির মুছাফফা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ফিরোজের দাবি, এলাকার কয়েকটি পরিবারকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফল জানা যায়নি।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, অভিযানের দাবি
প্রবাসীর পরিবারের ওপর হামলার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি তখন জানিয়েছিলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ রয়েছে এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে অভিযান চলছে। এলাকায় পুলিশের টহলও জোরদার করা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরফভাটা ও আশপাশের এলাকায় হামলা, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। তাঁরা অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার, এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন।
একই ইউনিয়নে কয়েক দিনের ব্যবধানে সশস্ত্র হামলায় একটি পরিবারের পাঁচজন আহত হওয়ার অভিযোগ এবং এবার কৃষক হত্যার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে দুটি ঘটনায় একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জড়িত কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় উদ্‌ঘাটনে পুলিশের তদন্তই এখন গুরুত্বপূর্ণ।